
সুনির্মল সেন | বিশেষ প্রতিবেদন
আজ ২২ মার্চ। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে নবীগঞ্জের মাটিতে প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলার পতাকা। উত্তাল সেই দিনগুলোতে যখন সারা দেশ স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত, তখন তিতুমীর কলেজের ছাত্রনেতা ও গেরিলা যুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ-এর নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল।
একাত্তরের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ছাত্রনেতা শরিফ নুরুল আম্বিয়ার পরামর্শে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নবীগঞ্জে আসেন আব্দুর রউফ। তাঁর সাথে ছিলেন তিতুমীর কলেজের তৎকালীন ভিপি কামাল আহমেদ ও ছাত্রনেতা মো. শাহাবুদ্দিন। ২০ মার্চ রাতে নবীগঞ্জে পৌঁছে তাঁরা নবনির্বাচিত এমপি আব্দুল আজিজ চৌধুরীর বাসভবনে অবস্থান নেন এবং পরদিন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল হক চৌধুরীর সঙ্গে পতাকা উত্তোলনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
১৯৭১ সালের ২২ মার্চ সকাল ১০টা। নবীগঞ্জ ডাকবাংলো প্রাঙ্গণ তখন ছাত্র-জনতার স্লোগানে প্রকম্পিত। বিশিষ্ট মুরুব্বি ও কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়:
পতাকা পুড়িয়ে ফেলা: তৎকালীন ছাত্রনেতা ভিপি কামাল আহমেদ উড্ডীয়মান পাকিস্তানি পতাকাটি নামিয়ে এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়: তুমুল করতালির মধ্যে ছাত্রনেতা আব্দুর রউফ তাঁর সহযোদ্ধা শাহাবুদ্দিনকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
জনতার অংশগ্রহণ: যুগল-কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেদিন চারদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
এই কর্মসূচি সফল করতে মো. বদরুজ্জামান, আব্দুল হান্নান, ছানু মিয়া, মোহাম্মদ আলীসহ একঝাঁক তরুণ ছাত্রনেতা দিনব্যাপী গণসংযোগ করেছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ডা. মিম্বারুর রহমান চৌধুরী, আলহাজ হীরা মিয়া, আব্দুস সোবহান মাস্টারসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
নবীগঞ্জের এই ঐতিহাসিক দিবসটি প্রতিবছর অনেকটা নিভৃতেই পালিত হতো। এই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রধান কারিগর বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দিবসটি স্মরণে রাখতেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, গত ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে এই বীর সেনানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি: আজ পতাকা উত্তোলন দিবসে নবীগঞ্জবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের, যাঁদের অসীম সাহসিকতায় একাত্তরের এই দিনে নবীগঞ্জের আকাশ দেখেছিল স্বাধীনতার প্রথম ঝিলিক।