
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঈশ্বরদী (পাবনা) | ৩০ মে, সোমবার
ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে উন্মুক্ত দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা, শারীরিক নির্যাতন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের উপস্থিতিতেই প্রভাবশালী একটি চক্রের এই তাণ্ডব ঈশ্বরদীতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
সোমবার (৩০ মে) সকাল ৯টা থেকে ঈশ্বরদী উপজেলার ঈশ্বরদী ডিগ্রী চরের ভূমি উন্নয়ন কর সংক্রান্ত উন্মুক্ত দরপত্রের শিডিউল জমা দেওয়ার কথা ছিল। দরপত্রে অংশ নিতে ব্যবসায়ী পায়েল হোসেন রিন্টু, আফজাল হোসেন এবং জাতীয় কৃষক পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘কুল ময়েজ’ উপজেলা সদরে গেলে শুরু থেকেই তারা বাধার মুখে পড়েন।
প্রশাসনের সামনেই হামলা ও লাঞ্ছনা
অভিযোগকারী জানান, শুরুতে এসিল্যান্ড কার্যালয় থেকে শিডিউল দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। দীর্ঘ নাটকীয়তার পর এসিল্যান্ডের হস্তক্ষেপে শিডিউল পেলেও তা জমা দিতে গেলে বাধার সৃষ্টি করে স্থানীয় ‘জামাতের আইন বিষয়ক সম্পাদক’ হাফিজ মেম্বারসহ একদল সশস্ত্র ব্যক্তি।
একপর্যায়ে ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন এসিল্যান্ডের কক্ষের ভেতরেই শিডিউল পূরণ করার সময় হাফিজ মেম্বার, মামুন (সংসদ সদস্যের ভাতিজা), সাড়া ইউনিয়ন জামাতের আমির রাজ্জাক ও মঞ্জুর নেতৃত্বে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়। তারা আফজাল হোসেনের দরপত্র সংক্রান্ত কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে এবং তাকে টেনেহিঁচড়ে মসজিদের পেছনে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করে। পরে পুলিশ তাকে রক্তাক্ত ও ছেঁড়া কাপড় পরা অবস্থায় উদ্ধার করে ঈশ্বরদী মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে।
৩৮ লাখ টাকা ছিনতাই ও ‘অস্ত্র নাটক’
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে ব্যবসায়ী রিন্টুর সহযোগী রাব্বানীকে নিয়ে। দরপত্রের জামানত হিসেবে রাব্বানীর কাছে থাকা একটি ব্যাগে ৩৮ লাখ টাকা ছিল। অভিযোগকারীর দাবি, সকাল সোয়া ৯টার দিকে হাফিজ মেম্বারের লোকজন রাব্বানীকে টাকাসহ অপহরণ করে নিয়ে যায়।
পরদিন মঙ্গলবার জানা যায়, ওই যুবককে পাবনা ডিবি পুলিশের কাছে ‘অবৈধ অস্ত্রসহ’ হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা আত্মসাৎ করতে এবং দরপত্র থেকে সরিয়ে দিতেই এই সাজানো অস্ত্র মামলা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় নিয়ে ডিবি পুলিশের নথিতেও গড়মিলের অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
দরপত্র কারসাজি ও বিপুল লোকসান
পায়েল হোসেন রিন্টু অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেট চক্রটি গতবারের ২৩ লাখ টাকার ইজারা এবার মাত্র ৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে বাগিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার (রিন্টু) উপস্থিতিতে দরপত্র ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় পৌঁছালে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। এ সময় তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, “তোর কারণে ২৩ লাখ টাকার জিনিস আমাদের ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দিয়ে নিতে হচ্ছে।”
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
উন্মুক্ত দরপত্রে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ। ভুক্তভোগী রিন্টু বলেন,
“এসিল্যান্ড, ইউএনও এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই বারবার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হয়েছে। তারা আমাকে আশ্বস্ত করলেও ঘটনা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমার লোক ও টাকা ছিনতাই হওয়ার পর তাৎক্ষণিক উদ্ধারে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেওয়া হয়নি।”
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যদিও দরপত্র শেষে সহকারী পুলিশ সুপার রিন্টুকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন, তবুও প্রভাবশালী চক্রটির হুমকির মুখে তারা ভীতসন্ত্রস্ত। এই ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ছিনতাই হওয়া ৩৮ লাখ টাকা উদ্ধার এবং বিতর্কিত দরপত্র বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।