আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ইসলামাবাদ বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে আনতে পাকিস্তান বারবার এক ‘অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। ১৯৭১ সালের চীন-মার্কিন সম্পর্ক থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের বর্তমান মার্কিন-ইরান সংলাপ—ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক পথচলা দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য।
১. স্নায়ুযুদ্ধের মোড় পরিবর্তন: কিসিঞ্জারের বেইজিং সফর (১৯৭১)
পাকিস্তানের কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল ১৯৭১ সাল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যস্থতায় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ইসলামাবাদ থেকে গোপনে বেইজিং সফর করেন। এই একটি সফল উদ্যোগ কয়েক দশকের মার্কিন-চীন বৈরিতার অবসান ঘটায় এবং বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।
২. আফগান সংকটের সমাধান ও দোহা প্রক্রিয়া
আফগানিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তান সবসময়ই কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল:
-
জেনেভা চুক্তি (১৯৮৮): পাকিস্তানের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতায় আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম হয়।
-
দোহা চুক্তি (২০২০): দীর্ঘ ২০ বছরের আফগান যুদ্ধের অবসানে ওয়াশিংটনের অনুরোধে তালেবানদের আলোচনার টেবিলে এনে ঐতিহাসিক মার্কিন-তালেবান শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করতে প্রধান ভূমিকা রাখে পাকিস্তান।
৩. মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বর্তমান মার্কিন-ইরান সংলাপ
ওআইসি-র প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে পাকিস্তান বিভিন্ন সময় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার বিরোধ মেটাতে কাজ করেছে। ২০১৯ সালে ইরান-সৌদি আরবের উত্তেজনা প্রশমনে দূত হিসেবে কাজ করার পর, বর্তমানে দেশটি এক অসাধ্য সাধন করতে চলেছে।
ইসলামাবাদে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে শান্তি সংলাপ চলছে, তাকে আধুনিক কূটনীতির অন্যতম বড় চমক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদার—এই দ্বিমুখী অবস্থানের সুবিধা নিয়ে পাকিস্তান সফলভাবে এই সংলাপ আয়োজন করেছে।
কেন পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সফল?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সফলতার পেছনে তিনটি মূল চালিকাশক্তি কাজ করে:
-
ভৌগোলিক অবস্থান: চীন, ইরান ও আফগানিস্তানের সংযোগস্থলে অবস্থান দেশটিকে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।
-
প্রভাবশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা: অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর (যেমন তালেবান) ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে পাকিস্তানকে অপরিহার্য করে তোলে।
-
ভারসাম্যপূর্ণ মৈত্রী: বেইজিংয়ের সাথে ‘চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব’ এবং ওয়াশিংটনের সাথে ‘অপরিহার্য অংশীদারিত্ব’—এই দুই বিপরীতমুখী সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা পাকিস্তানের বিশেষ পারদর্শিতা।
উপসংহার
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা অর্থনীতি যেমনই থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটির প্রভাব ম্লান হয়নি। ডন নিউজ ও রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান বারবার এক নির্ভরযোগ্য পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান মার্কিন-ইরান সংলাপ সফল হলে এটি হবে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মুকুটে আরও একটি অনন্য পালক।