সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন হাজারো মানুষ বাঁচার আশা নিয়ে ছুটে আসেন । ৯০০ শয্যার এই বৃহৎ চিকিৎসা কেন্দ্র সিলেট অঞ্চলের সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু সেবার এই পবিত্র প্রাঙ্গণে কান পাতলেই এখন শোনা যায় অনিয়ম আর জিম্মি দশার আর্তনাদ।
রোগীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালজুড়ে শেকড় গেড়েছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বহির্বিভাগ থেকে জরুরি বিভাগ সবখানেই এখন ওত পেতে থাকে দালাল চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সকল সিন্ডিকেট স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক শক্তির দাপটে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব চললেও মিলছে না কোনো স্থায়ী প্রতিকার। আর এর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে অসহায় রোগীদের।
বহির্বিভাগ থেকে জরুরি ফটক সর্বত্রই দালালদের অবাধ বিচরণ। ডাক্তার দেখানোর সিরিয়াল বা কম খরচের প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিক ও ফার্মেসিতে নেওয়াই এদের কাজ। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকার পরও, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসহায় রোগীদের বাইরের চড়া দামের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে বাধ্য করছে এই চক্র।
আর এদিকে হাসপাতালের প্রধান সড়ক এখন প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের অবৈধ পার্কিং জোন। জরুরি পথ আটকে গাড়ি রাখায় তীব্র যানজটের শিকার হচ্ছে সরকারি জরুরি গাড়ি ও মুমূর্ষু রোগীবাহী যানবাহন। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট এই চালক সিন্ডিকেটের সদস্যরা মৃতদেহ বা রেফার্ড রোগীদের পরিবহনের ক্ষেত্রে স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে থাকে।
সরেজমিনে হাসপাতালের ভেতরে যত্রতত্র পার্কিংয়ের পাশাপাশি সড়ক ও অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনাও চোখে পড়ে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে চলাচলের রাস্তার পাশে ম্যানহোলের ঢাকনা ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা সিমেন্টের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াতের এই পথে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙা ম্যানহোল যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
হাসপাতালের বাউন্ডারির ভেতর ও ফটকের আশপাশে বসেছে অবৈধ সবজি, ফলমূল ও আখের রসের দোকান। প্রধান ফটকের ঠিক পাশেই গড়ে উঠেছে অস্থায়ী চায়ের দোকান ও হকারদের আস্তানা, যেখানে দিনভর লেগেই থাকে বহিরাগতদের ভিড়। একটি স্পর্শকাতর ও বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রধান প্রবেশদ্বারে এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশ হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে।
সার্বিক এই অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন, ভারপ্রাপ্ত) ডাক্তার কাজী আব্দুল্লাহ কায়সার বলেন, “রোগীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু তারা সরাই দেওয়ার পরেও প্রতিনিয়ত আইসা আবার ভিড় করে। তারপরও আমরা একটা চেষ্টা করছি একটা বিকল্প পার্কিং এর ব্যবস্থা করা যায় কি না, এই ব্যাপারে আমরা তৎপর আছি।”
দালালদের উপদ্রব প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “প্রতিদিন বা দুই একদিন পর পরই দেখা যায় যে আমাদের পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য আছে তারা একজন বা দুইজন দালাল, ধোকাবাজ এদেরকে গ্রেফতার করে এবং আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতাল সেনসিটিভ জায়গা হওয়ায় তারা ‘আমার রোগী আছে’ বলে এই সুবিধাটাকে কাজে লাগায়। তাই একদম পুরোপুরি মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তারা অত্যন্ত সচেতন হলে আমরা মনে করি যে এই বিষয়টি থেকে আমাদের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।”
দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ও দালালদের চতুর সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি পদে পদে তারা হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সিলেট অঞ্চলের এই একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালের সুনাম ধরে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দিতে অনতিবিলম্বে হাসপাতাল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।