অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :: সিলেট নগরীর শাহপরাণ থানাধীন বালুচর। বাইরে থেকে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত খালেদ আহমেদকে ঘিরে এলাকায় রয়েছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। পুলিশের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মারামারি, অস্ত্র ব্যবহার, হত্যাচেষ্টা, নারী লাঞ্ছনা, চুরি, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আদালতের সাজা এবং তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হলে বালুচর এলাকায়ও অভিযান চালানো হয়। এরপরই পুলিশের বিরুদ্ধে বাসায় প্রবেশ, ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পুলিশের দাবি, চলমান অভিযানকে বিতর্কিত করতেই এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া অভিযোগগুলোকে সত্য বা মিথ্যা—কোনোটিই চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।
মামলার নথিতে একাধিক অভিযোগ
পুলিশের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, খালেদ আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আদালতের সাজা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬ ও ৩০৭ ধারাসহ ৩৫৪, ৩৭৯, ৪২৭ ও ৫০৬ ধারায় বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দ্রুত বিচার আইনে মামলা এবং Negotiable Instruments Act-এর ১৩৮ ধারায় মামলার তথ্যও রয়েছে।
তবে মামলায় অভিযোগ আনা এবং আদালতে তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এসব মামলার বর্তমান বিচারিক অবস্থা ও কোন কোন অভিযোগে আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়েছে—তা নথি যাচাই করে পৃথকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, খালেদ আহমেদ অতীতে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তার বিরুদ্ধে চোরাকারবার, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং অপরাধী চক্রকে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, বালুচরের আলোচিত ‘বুলেট মামুন’-এর সঙ্গে খালেদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা আদালতের সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের হাতে না থাকায় বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
ছেলে রায়হানকে ঘিরেও নাশকতার মামলা
খালেদের ছেলে রায়হানকেও ঘিরে রয়েছে নাশকতার অভিযোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিমানবন্দর থানার টিভি গেইট এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। পরে বালুচর এলাকায় মিছিলের প্রস্তুতির সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত রায়হানকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করা যায় না।
অভিযানের পর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সাম্প্রতিক অভিযানের পর খালেদের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে বাসায় প্রবেশ, ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ।
ওসি ফেরদৌস আহমেদ বলেন, “অভিযুক্ত খালেদের স্ত্রীর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। আমি তার বাসাতেও যাইনি।”
তার দাবি, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন এবং পুলিশের চলমান অভিযানকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, ওইদিন বালুচর এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের ঠিকানায় নিয়মতান্ত্রিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত ঘটনা
খালেদ আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা, আদালতের রায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তার পরিবারের বিরুদ্ধে থাকা মামলাসহ পুলিশের অভিযানের দিন কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা বাসায় প্রবেশ, ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগও স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং মিথ্যা প্রমাণিত হলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, বালুচর এলাকায় মাদক, চোরাচালান ও অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে—এমনটিই চান তারা।