বিশেষ প্রতিবেদন | ইর্বিল, কুর্দিস্তান
ইরান ও ইরাকের সীমান্তঘেঁষা তুষারশুভ্র পাহাড়ের গভীরে, লোকচক্ষুর অন্তরালে এক গোপন গুহা। বাইরে নিস্তব্ধতা থাকলেও ভেতরে বইছে যুদ্ধের উত্তাপ। এখানে বসেই তৈরি হচ্ছে এমন এক সামরিক পরিকল্পনা, যা কেবল ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পেশমার্গা এবং তাদের আদর্শিক সহযোগী সংগঠনগুলো এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বহু বছরের দমন-পীড়নের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে অস্তিত্ব সংকটের চরম ঝুঁকি।
গুহা থেকে সূক্ষ্ম অপারেশন: পিজাক-এর প্রস্তুতি
অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে গুহার ভেতরে দেখা যায় এক উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন কক্ষ। সেখানে প্রস্তুত ‘কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি’ বা পিজাক (PJAK)-এর নারী ও পুরুষ যোদ্ধারা। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি দীর্ঘকাল ধরে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে কাজ করছে।
সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, তারা এখন ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ চূড়ান্ত আদেশের অপেক্ষায় আছেন। এই যোদ্ধাদের জীবন অনেকটা সন্ন্যাসীদের মতো কঠোর শৃঙ্খলায় আবদ্ধ—মদ্যপান নিষিদ্ধ, ধূমপানে নিরুৎসাহ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। তাদের মূল আদর্শিক ভিত্তি হলো নারী সমতা, পরিবেশবাদ এবং স্থানীয় গণতন্ত্র।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও আন্তর্জাতিক জটিলতা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। গেরিলা যুদ্ধে অভিজ্ঞ এই যোদ্ধারা সীমান্তের কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি ইউরোপে বসবাসরত অনেক ইরানি কুর্দিও এখন লড়াইয়ে অংশ নিতে ফিরে আসছেন।
তবে পিজাকের সামনে বড় বাধা তাদের আন্তর্জাতিক পরিচয়। সংগঠনটি আব্দুল্লাহ ওচালান ও পিকেকে (PKK)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রেখেছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুর্দিদের প্রতি দোদুল্যমান নীতি এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কৌশলগত স্বার্থ এই অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আতঙ্ক
ইরানের ভেতরে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে কুর্দিদের সম্পর্ক বেশ জটিল। নির্বাসিত ইরানি বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি কুর্দিদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্সিয়ান জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ভয় কাজ করে যে, কুর্দিরা কি কেবল স্বায়ত্তশাসন চায় নাকি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চায়? এই অবিশ্বাস কুর্দিদের বৃহত্তর আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইর্বিল: এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র
ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী ইর্বিল ইতিমধ্যেই এক অস্থির জনপদে পরিণত হয়েছে। ইরানের ড্রোন হামলা এখানে নিয়মিত ঘটনা। কুর্দি ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হলেও সেখানে কার্যকর মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় যোদ্ধারা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ইতিহাস ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
১৯৪৬ সালে স্বল্পস্থায়ী স্বশাসন এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী দমন-পীড়নের ইতিহাস কুর্দিদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ। বর্তমানে তাদের সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
একজন প্রবীণ কুর্দি নেতার মতে:
“বোমা হামলায় স্বাধীনতা আসে না। প্রকৃত পরিবর্তন আসে ভেতর থেকে—শ্রমিক, শিক্ষক আর সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে।”
যদি বর্তমান সরকার টিকে যায়, তবে কুর্দিরা হবে প্রতিশোধের প্রথম লক্ষ্যবস্তু। আর যদি সরকারের পতন ঘটে, তবে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে তুরস্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলো জড়িয়ে পড়তে পারে। সুযোগ ও বিপদের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই এখন নির্ধারণ করবে কুর্দিদের ভবিষ্যৎ—মুক্তি নাকি আরও গভীর সংকট।