সুনির্মল সেন | কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার বুকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মনে ত্রাস সৃষ্টি করা এক দুর্ধর্ষ গেরিলা দলের নাম ছিল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। এই দলেরই অন্যতম মেধাবী ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন শাফী ইমাম রুমী। উচ্চশিক্ষার নিশ্চিত সুযোগ হেলায় তুচ্ছ করে দেশের টানে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়া এই বীরের ত্যাগ চিরভাস্বর।
ক্যারিয়ারের চেয়ে দেশ বড়
১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রুমী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। আদমজী স্কুল ও ঢাকা কলেজের পাঠ চুকিয়ে তিনি বুয়েটে ভর্তি হন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯ এপ্রিল ১৯৭১, যখন দেশ জ্বলছে, তখন ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের মায়া ত্যাগ করে মা জাহানারা ইমামকে রাজি করিয়ে যুদ্ধের পথে পা বাড়ান রুমী।
মেলাঘর থেকে ক্র্যাক প্লাটুন
রুমী সেক্টর-২-এর অধীনে খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দারের তত্ত্বাবধানে ভারতের মেলাঘরে কঠিন গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ঢাকায় ফিরে যোগ দেন বিখ্যাত ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন হামলা এবং ধানমন্ডির দুর্ধর্ষ অপারেশনগুলোতে তার রণকৌশল ও সাহসিকতা পাকিস্তানি বাহিনীকে দিশেহারা করে দিয়েছিল।
নিখোঁজ ও শাহাদাত
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা রুমীর নিজ বাড়ি থেকে তাকেসহ পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যায়। আটক অবস্থায় তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। ৩০ আগস্টের পর রুমীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানি সেনারা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে।
শহীদ জননী ও রুমীর উত্তরাধিকার
রুমীর এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই তার মা জাহানারা ইমাম পরবর্তী সময়ে পরিচিতি পান ‘শহীদ জননী’ হিসেবে। তিনি আমৃত্যু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। রুমী কেবল একজন যোদ্ধাই নন, তিনি আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক।
উপসংহার: ২৯ মার্চ শহীদ রুমীর জন্মদিন। আজ বাংলার মুক্তিকামী মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। যার রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা, সেই রুমীরা বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। জয়তু শহীদ রুমী। জয়তু বাংলাদেশ।