বিশেষ বিশ্লেষণ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপে মার্কিন বিমানবাহিনীর হামলা মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশলে এক নতুন ও বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘সফল সামরিক পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, এই হামলার গভীরতা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে বইছে উদ্বেগের ঝড়।
তেলের বাজার ও ট্রাম্পের দ্বিমুখী নীতি
ট্রাম্পের বিবৃতিতে একটি কৌশলগত সতর্কতা স্পষ্ট—তিনি ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো এখনই পুরোপুরি ধ্বংস করতে চান না। কারণটি মূলত অর্থনৈতিক। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয় এই খারগ দ্বীপ দিয়ে। এখানে বড় ধরনের আঘাত মানেই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ হ্রাস এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া। তেল স্থাপনাকে ‘নিরাপদ’ রেখে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমে ট্রাম্প তেহরানকে একটি কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই কৌশলে ইরানকে কতটা দমানো সম্ভব?
মার্কিন কৌশল ও বাস্তবতার সংঘাত
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপের মতে, এই হামলা মূলত আমেরিকার ‘হতাশা’ থেকে উদ্ভূত। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের নতুন নেতৃত্ব ও আইআরজিসি (IRGC) আরও বেশি সংহত ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। পেপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খারগ দ্বীপে হামলায় সাময়িক সামরিক ক্ষতি হলেও কৌশলগতভাবে ইরানকে দমানো যায়নি; বরং এটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।
আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার
এই হামলার রেশ কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ নেই। বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে রকেট হামলা এবং মার্কিন কূটনীতিকদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা প্রমাণ করে যে, লড়াই এখন বহুমুখী। ইরাক, ইয়েমেন এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রান্তে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে প্রস্তুত। যদিও হামাস আঞ্চলিক ভ্রাতৃত্ব রক্ষার খাতিরে প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু না করতে ইরানকে অনুরোধ করেছে, তবে সংঘাতের মাত্রা সেই অনুরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘ডেথ ট্র্যাপ’?
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে বারবার ‘হরমুজ প্রণালি’র প্রসঙ্গ উঠে আসছে। বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে এই জলপথ বন্ধ করে দেয়, তবে কেবল আমেরিকা নয়, চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিগুলোও চরম সংকটে পড়বে। এর ফলে ইরানকে একঘরে করার মার্কিন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
উপসংহার: খারগ দ্বীপের হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অগ্নিগর্ভ মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তেহরান যদি পাল্টা আঘাত হানে এবং ট্রাম্প তাঁর হুমকি অনুযায়ী তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার পথে হাঁটেন, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। এখন দেখার বিষয়, তেহরান কি আলোচনার টেবিলে ফিরবে, নাকি পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী হবে?