আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
(নিক্কেই এশিয়া ও স্থানীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে)
এক সময়কার ‘হিপ্পি ট্রেইল’-এর জনপ্রিয় গন্তব্য পাকিস্তান দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে আবারও বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। তবে এবারের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনের কারিগর হিসেবে সামনে আসছেন দেশটির একদল সাহসী ও উদ্যমী নারী।
জাভেরিয়ার গল্প: পর্যটক থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইড
লাহোরের ৩৬ বছর বয়সী নারী জাভেরিয়া আনোয়ার। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো হুনজা উপত্যকা ভ্রমণ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাহাড় আর নদীর মায়ায় পড়ে এক বছর পরেই যুক্ত হন একটি পর্যটন কোম্পানির সঙ্গে। বর্তমানে তিনি একজন পেশাদার লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইড। পাঞ্জাবের প্রাচীন হিন্দু মন্দির থেকে শুরু করে চীনা সীমান্তের আলপাইন হ্রদ—সবখানেই পর্যটকদের পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
জাভেরিয়া বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরুষদের মনস্তত্ত্ব। তারা একজন স্বাধীন নারীর নেতৃত্ব মেনে নিতে সহজে প্রস্তুত হয় না।” তবুও তিনি এবং তাঁর মতো আরও অনেক নারী এখন পাকিস্তানের পর্যটন খাতের নেতৃত্বের সারিতে।
নিরাপদ স্বর্গ: হুনজা উপত্যকা
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় হুনজা উপত্যকা এখন নারী পর্যটকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ‘রুট ১৬’ নামক ভ্রমণ সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা সোবিয়া মক জানান, কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশীয় পর্যটন বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে বড় শহর ও বিদেশ থেকে আসা নারীরা হুনজার বুরুশো ও ওয়াখি সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেদের নিরাপদ বোধ করছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এই অঞ্চলে অপরাধের হার প্রায় শূন্য এবং নারী-পুরুষের সাক্ষরতার হার ৯৫ শতাংশ, যা পাকিস্তানের জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
পর্যটনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
বর্তমান পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) পর্যটন খাতের অবদান ৫.৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের সরকারি তথ্যমতে, ২০ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক দেশটি ভ্রমণ করেছেন।
-
বিকল্প আয়: তীব্র মূল্যস্ফীতির এই সময়ে হুনজার গুলমিতে অনেক নারী এখন নিজস্ব কফি হাউস পরিচালনা করছেন।
-
সামাজিক বাধা জয়: সিন্ধুর ইউটিউবার মিসা তালপুর ২০১৬ সালে একা ভ্রমণে বেরিয়ে যে বাধা পেয়েছিলেন, আজ তিনি নিজেই একটি ‘মাউন্টেন হোমস্টে’ পরিচালনা করে সফল উদ্যোক্তা।
ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইস্তাম্বুল থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত বিস্তৃত ‘হিপ্পি ট্রেইল’-এর গুরুত্বপূর্ণ স্টপ ছিল পাকিস্তান। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সেই সুদিন ফিরছে। বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গর মধ্যে ৫টিই পাকিস্তানে অবস্থিত। এই প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে নারী গাইডদের সংবেদনশীল আতিথেয়তা যুক্ত হওয়ায় বিদেশি পর্যটকদের কাছে পাকিস্তান এখন নতুন আকর্ষণ।
সারকথা: নারী গাইড ও হোস্টদের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি কেবল পর্যটন নয়, বরং পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।