শাহ বিলিয়া জুলফিকার | বিশেষ প্রতিবেদন
ফেসবুকে পরিচয়, এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে প্রথম দেখা। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, আর সেই প্রেম থেকেই পরিণয়। তবে এই গল্পটি কেবল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের নয়, বরং একসঙ্গে স্বপ্নজয়ের। ৩৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়ারি সার্ভিসে (বিজেএস) জীবন নাহার ৩৮তম এবং মহিউদ্দীন ৭৩তম স্থান অধিকার করে সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন। দুই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই শিক্ষার্থীর লক্ষ্য ছিল এক—ন্যায়বিচারের আসনে বসা।
ফেসবুক থেকে ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাস
২০১৮ সালে ফেসবুকে পরিচয়ের পর ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত কথা বলা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন নাহার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিউদ্দীনের। ২০১৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে তাঁদের প্রথম দেখা হয়। সেই বন্ধুত্ব দ্রুতই প্রেমে রূপ নেয়। তবে তাঁদের এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল একে অপরের ক্যারিয়ারের প্রতি অগাধ সমর্থন।
ভিন্ন প্রস্তুতি, অভিন্ন লক্ষ্য
জীবন নাহার ছিলেন বরাবরই মেধাবী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল বিচারক হওয়া। অন্যদিকে, মহিউদ্দীনের ধ্যান-জ্ঞান ছিল লাইব্রেরি আর আইনের ধারা। প্রস্তুতির সময় জীবন নাহার ছিলেন মহিউদ্দীনের বড় অনুপ্রেরণা। মহিউদ্দীনকে নিয়মিত পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করা থেকে শুরু করে জোর করে কোচিংয়ে ভর্তি করানো—সবই করেছেন জীবন নাহার।
মহিউদ্দীন হাসিমুখে স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“জীবন নাহার বলতেন, বাবার সামনে দাঁড়াতে হলে তোমাকে অবশ্যই জজ হতে হবে। এই কথাটিই আমার ভেতরে জেদ আর জেতার শক্তি জুগিয়েছে।”
প্রস্তুতির ‘শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং’ নীতি
তাঁদের প্রস্তুতির ধরন ছিল একে অপরের পরিপূরক। জীবন নাহার মুখস্থের চেয়ে বোঝার ওপর জোর দিতেন এবং চমৎকার নোট তৈরি করতেন। আর মহিউদ্দীন দক্ষ ছিলেন আইনের ধারা ও সেকশন মনে রাখতে। প্রিলিমিনারি থেকে শুরু করে লিখিত পরীক্ষা—প্রতিটি ধাপে তাঁরা একে অপরের খাতা দেখতেন, মক টেস্ট নিতেন এবং ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন।
সংকট ও উত্তরণ
লিখিত পরীক্ষার সময় মানসিক চাপে ভেঙে পড়লে মহিউদ্দীন হতেন জীবন নাহারের শক্তি। আবার প্রথমবার প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থ হওয়ার পর জীবন নাহারই মহিউদ্দীনের জন্য দৈনিক টার্গেট ঠিক করে দিয়েছিলেন। ভাইভা প্রস্তুতির সময় তাঁরা নিজেরাই নিজেদের মক ভাইভা নিতেন, এমনকি পোশাক ও কথা বলার ভঙ্গি নিয়েও একে অপরকে ফিডব্যাক দিতেন।
সাফল্যের শিখরে
অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে দুজনেই মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। জীবন নাহার ৩৮তম এবং মহিউদ্দীন ৭৩তম হয়ে তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করেন। বর্তমানে এই দম্পতি কেবল সুখী জীবনই কাটাচ্ছেন না, বরং হাজারো চাকরিপ্রার্থীর কাছে কঠোর পরিশ্রম আর পারস্পরিক সহযোগিতার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।