আব্দুর রহমান | ৬ মার্চ, ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য এবং তথ্যের গোপনীয়তা দীর্ঘকাল ধরে বজায় রেখেছিল পশ্চিমা স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলো। কিন্তু সেই প্রথা ভেঙে দিয়েছে চীনের বেসরকারি স্যাটেলাইট কোম্পানি মিজার ভিশন (MizarVision)। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে জর্ডান ও পারস্য উপসাগরে আমেরিকার সামরিক সমাবেশের ছবি প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গোপনীয়তার দেয়াল ভাঙল চীন
বছরের পর বছর ধরে প্ল্যানেট ল্যাবস বা ম্যাক্সার টেকনোলজিসের মতো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী সংবেদনশীল ছবিগুলো হয় আড়াল করেছে, নয়তো ফিল্টার করে প্রকাশ করেছে। কিন্তু মিজার ভিশন সেই অদৃশ্য সেন্সরশিপ ভেঙে সামরিক মোতায়েনের দৃশ্যগুলো জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই পদক্ষেপ কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এক গভীর কৌশলগত বার্তা।
ইরানের ‘চোখ’ এখন বেইজিংয়ের কক্ষপথে
ইরানের নিজস্ব স্যাটেলাইট কর্মসূচি অত্যন্ত সীমিত। হাই রেজুলেশনের অবিরাম সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা তেহরানের নেই। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে:
-
ইরানের হাতে মাত্র ১৪টি সক্রিয় স্যাটেলাইট রয়েছে, যার বেশিরভাগই টেলিযোগাযোগের জন্য।
-
বিপরীতে চীনের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা প্রায় ১,১০০ থেকে ১,৩৫০০টি।
-
চীনের এই বিশাল নেটওয়ার্ক নিখুঁত ইমেজিং, মেঘ ভেদ করে রাডার পর্যবেক্ষণ এবং সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সক্ষম।
জিলিন-১: যুদ্ধের নতুন নিয়ন্ত্রক
মিজার ভিশন মূলত ছবি কেনে চ্যাং গুয়াং স্যাটেলাইট টেকনোলজির কাছ থেকে, যারা জিলিন-১ (Jilin-1) নামক বিশাল একটি স্যাটেলাইট বহর পরিচালনা করে। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
-
সার্বক্ষণিক নজরদারি: ১২০টিরও বেশি সক্রিয় ইউনিট নিয়ে গঠিত এই ক্লাস্টার দিনরাত যেকোনো অঞ্চলের ওপর নজর রাখতে পারে।
-
হাই রেজুলেশন: এটি ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার রেজোলিউশনের সাদা-কালো ছবি এবং উচ্চমানের ভিডিও ধারণে সক্ষম।
-
শত্রুর রাডারে ধুলো: মিজার ভিশন ইচ্ছাকৃতভাবে ছবির মান কমিয়ে (ডাউনগ্রেড করে) প্রকাশ করে, যাতে তাদের প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা শত্রুরা বুঝতে না পারে।
ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ও নিষেধাজ্ঞা
২০২৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্বীকার করে যে, চ্যাং গুয়াং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সরাসরি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরানকে সহায়তা দিচ্ছে। লোহিত সাগরে মার্কিন স্বার্থের ওপর হুতিদের নিখুঁত হামলার পেছনে চীনের এই স্যাটেলাইট সহায়তাকে দায়ী করে ওয়াশিংটন চ্যাং গুয়াংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।
কৌশলগত বার্তা: আধিপত্যের অবসান?
চীনের এই ছবি প্রকাশের পেছনে দুটি মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট:
১. সতর্কবার্তা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বুঝিয়ে দেওয়া যে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ চীনের কড়া নজরে রয়েছে।
২. তথ্য সমতা: তথ্যের ওপর পশ্চিমা একচেটিয়া আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করা এবং বহুমেরু বিশ্বের বাস্তবতা তুলে ধরা।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, তখন চীন বা ইরানের মতো অংশীদারদের সরবরাহকৃত ছবি সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। আধুনিক যুদ্ধে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগেই তথ্যের লড়াই শুরু হয়, আর চীন প্রমাণ করে দিয়েছে—সেই উচ্চস্থানে তারা এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সহজ ভাষায় স্যাটেলাইট কক্ষপথের তুলনা:
| ধরন |
উচ্চতা |
কাজ |
| LEO (লোয়ার আর্থ অরবিট) |
১৬০ – ২,০০০ কিমি |
গোয়েন্দা নজরদারি ও হাই রেজুলেশন ছবি (যেমন: জিলিন-১) |
| GEO (জিওস্টেশনারি অরবিট) |
৩৬,০০০ কিমি |
আবহাওয়া ও টেলিযোগাযোগ (একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর স্থির থাকে) |