৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৬ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

যুদ্ধের মাঝে ‘সবুজ স্বর্গ’ জেবেল মারা

admin
প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর, রবিবার, ২০২৫ ১২:৪২:৪৮
যুদ্ধের মাঝে ‘সবুজ স্বর্গ’ জেবেল মারা

Manual7 Ad Code

দারফুরের এই পাহাড়ি অঞ্চলে শান্তির ছোঁয়া, তবু যুদ্ধের ছায়া ঘন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গৃহযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষে জর্জরিত সুদানে এমন একটি অঞ্চল আছে, যেখানে গেলে মনে হয়—দেশে কোনো সংঘাত নেই, নেই যুদ্ধের ভয়। এই বিস্ময়কর জায়গাটির নাম জেবেল মারা পর্বতমালা
দারফুরের পশ্চিমে অবস্থিত এই সবুজ পাহাড়ি ভূখণ্ড এখন যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের ভেতর এক টুকরো স্বর্গ।

Manual5 Ad Code


🍊 ফলের প্রাচুর্যে বিপাকে কৃষকেরা

আড়াই বছরের সংঘাতে দেশজুড়ে ২৫ মিলিয়ন মানুষ (জনসংখ্যার অর্ধেক) খাদ্যসংকটে ভুগছে। জাতিসংঘ জানায়, অন্তত ৬ লাখ মানুষ এখন দুর্ভিক্ষকবলিত।
কিন্তু জেবেল মারায় উল্টো ছবি—এখানকার কৃষকেরা অতিরিক্ত ফলন নিয়ে বিপাকে।

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো অনুকূল জলবায়ু আর উর্বর মাটিতে জন্মায় বাদাম, কমলা, আপেল ও স্ট্রবেরি। নারীরা সকালে রঙিন পোশাকে শিশুদের নিয়ে গাধায় চড়ে মাঠে যান।
তবে এই প্রাচুর্যই এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। গলো শহরের এক বিক্রেতা হাফিজ আলী বলেন,

“আমরা প্রায় বিনা মূল্যে কমলা বিক্রি করি, অনেক সময় পচে যাওয়ার ভয়ে পথে ফেলে দিই।”

Manual1 Ad Code


⚔️ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ‘শান্ত এলাকা’

জেবেল মারা বর্তমানে সুদান লিবারেশন আর্মি (এসএলএ) – আবদুলওয়াহিদ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ ভূখণ্ড।
যদিও তারা চলমান যুদ্ধে নিরপেক্ষ, তবে ২০০৩ সালের দারফুর সংঘাতের পর থেকেই তারা সরকারের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তি করেনি।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলকে তারা নিজেদের “মুক্ত এলাকা” হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করছে।


🚧 অবরোধে বিচ্ছিন্ন জীবন

চারদিকে যুদ্ধ চলায় জেবেল মারা এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন। পশ্চিম ও উত্তরে র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এবং তাদের মিত্ররা প্রধান রাস্তাগুলো অবরোধ করে রেখেছে। দক্ষিণে সরকারি বাহিনী বোমা বর্ষণ করছে।
ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আর পণ্য নিয়ে যেতে পারছেন না এল-ফাশের বা চাদের সীমান্তবর্তী বাজারে।

তাভিলার ফল বিক্রেতা ইউসুফ বলেন,

Manual6 Ad Code

“মাত্র ১২ কিলোমিটার পথ যেতে পুরো দিন লেগে যেত। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে যুদ্ধের ভয়।”


🏚️ শরণার্থীদের নতুন আশ্রয়

আরএসএফের অবরোধ এড়িয়ে তাভিলা শহর এখন অস্থায়ী বাজার ও শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে।
হাজার হাজার মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে, ফলে অতিরিক্ত সরবরাহে ফলের দাম আরও কমেছে।
সাহসী কিছু ব্যবসায়ী এখান থেকে পণ্য নিয়ে বিপজ্জনক পথে অবরুদ্ধ শহরে পাচারের চেষ্টা করছেন।

Manual7 Ad Code

অন্যদিকে নেরতিতি শহরে সীমিত ব্যবসা শুরু হয়েছে। তবে সেখানকার এক ব্যবসায়ী সতর্ক করেন,

“বাজার সপ্তাহে মাত্র একদিন খোলে। রাস্তায় এখনো ডাকাতি হয়, ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ।”


💰 চেকপয়েন্ট ও চাঁদাবাজি

নেরতিতি ও জালিঙ্গেইয়ের মাঝপথে এখন দুই ডজনেরও বেশি চেকপয়েন্ট।
এসব নিয়ন্ত্রণ করছে আরএসএফ, আরব মিলিশিয়া ও কখনো সাদা পোশাকের সশস্ত্র ব্যক্তি—যারা জোর করে চাঁদা আদায় করে।
পাহাড়ি পথে ফেরার সময় এসএলএ-এর নিয়ন্ত্রিত চেকপয়েন্টেও একই চিত্র—তল্লাশি, জব্দ আর চাঁদা।


🏞️ স্বর্গের ভেতর দুঃখের গল্প

গলো শহরে আশ্রয় নেওয়া এক নারী জানান,

“আমাদের কোনো কাজ নেই, জমি নেই, আমরা জানি না কী করব।”

অসহায় মানুষগুলো স্কুল, ক্লিনিক আর সরকারি ভবনে ঠাঁই নিয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো নিরাপত্তার অভাবে ত্রাণ পৌঁছাতে পারছে না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে জেবেল মারা এখনো ফলের প্রাচুর্যে ভরা এক সবুজ স্বর্গ—
কিন্তু সেই স্বর্গের ভেতরেও লুকিয়ে আছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

এক ফল ব্যবসায়ী শেষমেশ হতাশ কণ্ঠে বলেন,

“আমরা যুদ্ধ নিয়ে ভাবি না। আমরা শুধু চাই, আমাদের কমলাগুলো যেন বিক্রি করতে পারি।”