৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সত্য প্রকাশের সাহস যেন কোনো সাংবাদিকের জন্য বিপদের কারণ না হয়

admin
প্রকাশিত ৩০ অক্টোবর, শুক্রবার, ২০২৬ ২৩:০১:১৮
সত্য প্রকাশের সাহস যেন কোনো সাংবাদিকের জন্য বিপদের কারণ না হয়

সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব

একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা অপরিসীম। সাংবাদিকেরা সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের লেখনী, ক্যামেরা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনেক অজানা সত্য প্রকাশ্যে আসে, জবাবদিহির পথ তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক যদি হুমকি, হামলা, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন, তবে তা শুধু একজন সাংবাদিকের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।

সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ করা, সত্যতা যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা। এই দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকে ভয়ভীতি বা অন্যায় চাপের মুখে পড়তে হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে মানুষের জানার অধিকার এবং সমাজের জবাবদিহিমূলক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সাংবাদিকের নিরাপত্তা মানে সত্য প্রকাশের নিরাপত্তা। তাই সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সাংবাদিক হুমকি বা হামলার শিকার হলে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বা অবস্থান যা-ই হোক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত মর্যাদা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আইনি সহায়তার সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকেরা যেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও নিরাপত্তা পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধেও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

তবে স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং পেশাগত নৈতিকতা অনুসরণ করা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়; বরং সত্য, যুক্তি ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে নির্ভয়ে কাজ করার অধিকার। একইভাবে সমালোচনা বা প্রশ্নের জবাব হওয়া উচিত তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে, হুমকি কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিকেতন (JONI)-এর মতো উদ্যোগ সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সাংবাদিকদের পেশাগত সংকটে সহযোগিতা, নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা জোরদার করার মতো উদ্যোগ সময়োপযোগী। এসব প্রচেষ্টা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনসম্মত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি, যেখানে সাংবাদিকেরা সত্য প্রকাশের কারণে ভীতসন্ত্রস্ত থাকবেন না; যেখানে তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সম্মানিত হবে; যেখানে অন্যায়ের অভিযোগের বিচার হবে নিরপেক্ষভাবে এবং জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্য জানার সুযোগ পাবে।

সাংবাদিকের কলম যেন ভয়ের কাছে নত না হয়, ক্যামেরা যেন সত্যের অনুসন্ধানে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলার অধিকার যেন সুরক্ষিত থাকে—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।

সত্য প্রকাশের সাহস যেন কোনো সাংবাদিকের জন্য বিপদের কারণ না হয়। সাংবাদিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ সাংবাদিক নিরাপদ থাকলে সত্য প্রকাশের পরিবেশ শক্তিশালী হয়, আর সত্য প্রকাশের পরিবেশ শক্তিশালী হলে জনগণের অধিকার ও ন্যায়বিচারের পথও সুদৃঢ় হয়।