
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন তারিখ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আলোচনা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে টানা ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতার আভাস পাওয়া গেলেও পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছে উভয় পক্ষ।
ভ্যান্সের ম্যারাথন বৈঠক ও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ পরিবেশ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ইসলামাবাদে পৌঁছান ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। সেখানে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে রোববার সকালে ক্লান্ত চোখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভ্যান্স বলেন:
“আমরা টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা করেছি এবং ইরানিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভালো খবর হলো আলোচনা ফলপ্রসূ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল, তবে খারাপ খবর হলো—আমরা এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি।”
এই আলোচনায় ভ্যান্সের সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারও উপস্থিত ছিলেন।
পারমাণবিক প্রশ্নে স্থবিরতা
আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আলোচনা নিবিড় ছিল এবং আমরা প্রায় সব পয়েন্টেই একমত হতে পেরেছিলাম। কিন্তু তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে রাজি হয়নি।”
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল—ইরানকে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে, উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে এবং প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। তবে ইরান এই শর্তগুলো মানতে রাজি হয়নি।
ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি ও নৌ-অবরোধ
আলোচনা থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ আরোপ করা হবে। এই পদক্ষেপের ফলে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও ট্রাম্প মনে করেন, এটি ইরানকে শর্ত মানতে বাধ্য করবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ না করে, তবে তাদের অবকাঠামোতে আরও হামলা চালানো হবে।”
আলোচনার উল্লেখযোগ্য অর্জন ও ব্যর্থতা
-
সদভাব তৈরি: দীর্ঘ কয়েক বছরের মধ্যে এটিই ছিল দুই দেশের কর্মকর্তাদের দীর্ঘতম সরাসরি বৈঠক। কর্মকর্তাদের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত ‘সুসম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে।
-
ইরানের অবস্থান: মার্কিন প্রতিনিধিদের ধারণা, যুদ্ধের ময়দানে ইরান যতটা দুর্বল, তারা নিজেদের তার চেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ভাবছে।
-
আঞ্চলিক শর্ত: পারমাণবিক ইস্যু ছাড়াও হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের অর্থায়ন বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি শুল্কমুক্ত করার শর্তে কোনো ঐকমত্য হয়নি।
পাকিস্তানের ভূমিকা
মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের ‘অসাধারণ আতিথেয়তা’র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন জে ডি ভ্যান্স। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উৎসাহেই ট্রাম্প এই আলোচনার নেতৃত্বে ভ্যান্সকে পাঠিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে পরবর্তী কোনো আলোচনার দিনক্ষণ ঠিক না করেই ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন।
রাজনৈতিক চাপ
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়েই চলেছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, গ্যাসের দাম সাময়িকভাবে বাড়তে পারে এবং নভেম্বরের আগে তা কমার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—তারা কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আলোচনায় ফিরবে, নাকি নতুন করে সংঘাতের দাবানল ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে।