বিশেষ প্রতিনিধি | সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জে বোরো ধান কাটার উৎসবের সমান্তরালে চলছে বজ্রপাতের আতঙ্ক। গত পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৬৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় সরকার কোটি টাকা ব্যয়ে লাইটনিং অ্যারেস্টার (বজ্রনিরোধক দণ্ড) স্থাপন এবং তালগাছ রোপণ করলেও তার সুফল পাচ্ছে না হাওরবাসী। স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারের এই উদ্যোগ কার্যত কোনো কাজে আসছে না।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান: থামছে না লাশের মিছিল
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে:
বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত কালবৈশাখী মৌসুমে হাওরে ধান কাটা ও মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত কৃষক ও জেলেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন।
বজ্রনিরোধক দণ্ড: জনহীন হাওর ছেড়ে হাটবাজারে
সুনামগঞ্জ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬টি উপজেলায় ১৮টি (বাস্তবে ২৪টি) বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে ‘ক্রিয়েটিভ সোলার অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়ম অনুযায়ী ৪০ ফুট উঁচু এই দণ্ড চারপাশের ১১০ মিটার এলাকা সুরক্ষা দেওয়ার কথা।
প্রকল্পের অসংগতিসমূহ: ১. ভুল স্থান নির্বাচন: স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু হয় সেই দুর্গম ও বৃক্ষহীন হাওরে দণ্ড না বসিয়ে বসানো হয়েছে হাটবাজার, উপজেলা পরিষদ বা জনবহুল এলাকায়। ২. অকার্যকারিতার শঙ্কা: দণ্ডগুলো সচল না অচল, তা নিয়ে খোদ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ৩. রক্ষণাবেক্ষণ: দণ্ড স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের ২ বছরের ওয়ারেন্টি শেষ হলেও এগুলো তদারকির জন্য কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।
সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন তালুকদারের মতে, “হাটবাজারে মানুষ এমনেই আশ্রয় নিতে পারে। খোলা হাওরে যেখানে মানুষ মরে, সেখানে দণ্ড না বসিয়ে বাজারে বসানো হাস্যকর।”
তালগাছ প্রকল্পের করুণ দশা
বজ্রপাত কমাতে ২০১৮ সালে জেলায় প্রায় ৪০ হাজার তালগাছ রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব তালগাছের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে রোপণ করা চারাগুলো মারা গেছে। অনেক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের কোনো কার্যক্রমই তাদের নজরে পড়েনি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
‘হাওর রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের সদস্য সজল কান্তি সরকার এই প্রকল্পকে ‘দায়সারা কার্যক্রম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাসিবুল হাসান স্বীকার করেছেন যে, দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে পিআইও-রা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
বিশ্লেষকদের অভিমত: বজ্রপাত এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বড় একটি দুর্যোগ। কেবল লোকালয় বা সরকারি ভবনে দণ্ড স্থাপন না করে, বৈজ্ঞানিক উপায়ে হাওরের মাঝখানে যেখানে কৃষকরা কাজ করেন, সেখানে ‘আশ্রয় শেড’ এবং ‘বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে হাওরবাসীর এই আহাজারি চলতেই থাকবে।