নিজস্ব প্রতিনিধি :: সিলেটে একই পরিবারের তিনজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আটক বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাক্রম বর্ণনা করা হলেও, সেই বর্ণনার সঙ্গে ঘটনার কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুল মিয়া পেশায় রং মিস্ত্রি এবং পার্টটাইম কসাই। প্রায় ২০ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল আব্দুস সাত্তার সাহেবের বাসার কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে। ঘটনার দিন সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে বাবুল মিয়া ‘মিতালী-১১১’ বাসায় প্রবেশ করেন। সেখানে শারীরিক সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন তিনি।
তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া এগিয়ে এলে তাকেও একই ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের বর্ণনায় বলা হয়েছে। এরপর সুরাইয়ার চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার ঘটনাস্থলে এলে তাকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা করে বাবুল মিয়া বাসা থেকে বেরিয়ে যান বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য আরও বলছে, বাসার পাশের একটি খালি জায়গায় ছুরিটি ফেলে দিয়ে বাবুল মিয়া রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন। ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ তাকে ওই এলাকা থেকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খালি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ছুরি উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। এ সময় সিলেটের পুলিশ কমিশনার ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া ঘটনাক্রম তুলে ধরেন।
তবে পুলিশের এই বর্ণনার কয়েকটি দিক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
প্রথমত, শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এলে সকাল সাড়ে ৯টার সময়টিই কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল—এটি তদন্তে যাচাই করার বিষয়।
দ্বিতীয়ত, যদি মূল উদ্দেশ্য শারীরিক সম্পর্ক করা হয়ে থাকে, তাহলে সঙ্গে ছুরি বহনের কারণ কী? ছুরিটি আগে থেকেই সঙ্গে ছিল, নাকি ঘটনাস্থলে কোনো পরিস্থিতিতে সেটি ব্যবহার করা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, তিনজনকে হত্যার পর একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি বাসার পাশের খালি জায়গায় ফেলে গেলেন কেন—এ বিষয়টিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ছুরি লুকানোর চেষ্টা ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে সেটি সেখানে ফেলা হয়েছিল, তা ফরেনসিক ও পারিপার্শ্বিক আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ণয় করা দরকার।
চতুর্থত, তিনটি হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনাস্থলের আশপাশের একই এলাকায় প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করলেন কেন—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি গুরুতর অপরাধের পর সাধারণত পালানোর চেষ্টা করবেন, নাকি স্বাভাবিকভাবে একই এলাকায় অবস্থান করবেন—এটি অপরাধের ধরন, মানসিক অবস্থা ও ঘটনার পরবর্তী আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, আটকের পর একজন অভিযুক্ত কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং তার বক্তব্যের কতটা স্বাধীন প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য উপাত্তের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এসব প্রশ্নের কোনোটি দিয়েই বাবুল মিয়া নির্দোষ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যকেও চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। কারণ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে অভিযুক্তের জবানবন্দির পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, ডিএনএ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ব্যবহৃত অস্ত্র, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে তিনজন মানুষ একই ঘটনায় নিহত হওয়ার মতো গুরুতর ঘটনায় তদন্তে কোনো ধরনের পূর্বধারণা বা তাড়াহুড়ো ভবিষ্যতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একটি হত্যাকাণ্ডের মোটিভও সাধারণত সরল কোনো গল্পের মতো একে একে সাজানো যায় না; বরং অপরাধের আগে, সময় ও পরে অভিযুক্তের আচরণ, সম্পর্ক, যোগাযোগ এবং শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক আলামত বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত চিত্র বের করতে হয়।
তাই এই ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার পাশাপাশি উত্থাপিত প্রশ্নগুলোরও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রয়োজন। তিনটি প্রাণহানির এই ঘটনায় সত্য উদঘাটনই হোক তদন্তের একমাত্র লক্ষ্য—কোনো নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠা নয়।