মিতালী-১১১: তদন্তের গতি কমেছে, নথি ও আলামত ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
মিতালী-১১১: তদন্তের গতি কমেছে, নথি ও আলামত ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
admin
প্রকাশিত ১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার, ২০২৬ ১৯:৫০:২৫
মিতালী-১১১: তদন্তের গতি কমেছে, নথি ও আলামত ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
ঘটনার পাঁচ দিন পরও উদ্ঘাটন হয়নি হত্যার মোটিভ, সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক নিয়েও প্রশ্ন
সিলেটের বহুল আলোচিত ‘মিতালী-১১১’ ট্রিপল মার্ডার মামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থলের ইউনিটে তদন্ত-সংক্রান্ত কাজ শেষ হওয়ার পর বাসাটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রমিক দিয়ে বাসার ভেতরে জমাট বাঁধা রক্তসহ বিভিন্ন আবর্জনা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে।
তবে ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, বাসার সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক পুলিশ খুলে নিয়ে গেলেও সেটি এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। আদালতে থাকা মামলার নথি অনুযায়ী, হার্ডডিস্কটি জব্দ হিসেবেও দেখানো হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে তিন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বা হত্যার মূল কারণ উদ্ঘাটনের তৎপরতা আশ্চর্যজনকভাবে ধীরগতির বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রিমান্ডে থাকা আসামি বাবুল মিয়াকে ঘিরেই এখনো তদন্তের বড় একটি অংশ এগোচ্ছে। আজ তার রিমান্ডের তৃতীয় দিন।
অন্যদিকে মামলার বাদী সেলিনা সুলতানার সন্দেহের তীরে থাকা ইম্পাল বিল্ডার্সের কর্ণধার ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজের অবস্থান নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। তিনি বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের মুখে নানা কথা
ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার সময় ভবনটির আশপাশে কী ঘটেছিল, কারা সেখানে ছিলেন কিংবা কারা বেরিয়ে গেছেন—এসব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এমনকি ঘটনাস্থলের বিপরীত পাশের একটি বাসা থেকে পাওয়া কথিত তথ্যের বরাত দিয়ে স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, হত্যাকাণ্ডের সময়ের আশপাশে ওই ভবন থেকে একসঙ্গে তিন থেকে চারজনকে নিচে নেমে যেতে দেখা গেছে।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়েছে কি না, কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না—তা স্পষ্ট নয়। ফলে স্থানীয়দের মুখে ছড়িয়ে পড়া এসব কথার সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এজাহারের পর কমেছে পুলিশের তৎপরতা?
ঘটনার প্রথম দুই দিনে পুলিশের মধ্যে যে ধরনের তৎপরতা ও উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, এজাহার দাখিলের পর তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট মহলে।
এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান তদন্ত অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ঘটনাস্থলের নকশা তৈরি এবং সূচি প্রস্তুত করা। এর বাইরে তদন্তে নতুন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি জনসমক্ষে আসেনি।
অবশ্য তদন্তের সব তথ্য প্রকাশ্যে না আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও হার্ডডিস্ক, জব্দ তালিকা এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তদন্ত কতদূর এগিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর না মেলায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
‘সুরতহাল’ নিয়েও প্রশ্ন
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি ‘সুরতহাল’। এ সংক্রান্ত তথ্য জানতে এক সাংবাদিক কোতোয়ালি থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওই কর্মকর্তা মামলাটি নিয়ে চাপের মধ্যে থাকার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সুরতহাল, ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত, জব্দ তালিকা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল—প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব নথি ও আলামতের অবস্থান নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
নথিতে নতুন সংযোজন নেই
আদালতে থাকা মামলার নথি পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাগজ যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। মামলা হওয়ার আগেই জব্দ করা আলামত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হলেও মামলার নথিতে এখনো কোনো জব্দ তালিকা দেওয়া হয়নি বলেও জানা গেছে।
তবে আইনগতভাবে তদন্তের পরবর্তী পর্যায়েও জব্দ তালিকা দাখিলের সুযোগ রয়েছে। ফলে এ মুহূর্তে শুধু জব্দ তালিকা না থাকার বিষয়টিকে তদন্তের চূড়ান্ত ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলোর অবস্থান ও সেগুলোর আইনানুগ নথিভুক্তি নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যেই এগোচ্ছে মিতালী-১১১ ট্রিপল মার্ডার মামলার তদন্ত। কিন্তু তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি কমে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর না মেলায় জনমনে নানা সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
পরিবারের দাবি—তদন্ত হোক সিআইডিতে
এ পরিস্থিতিতে নিহতদের পরিবার মামলাটি দ্রুত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডিতে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে।
পরিবারের এই দাবির পেছনে মূলত তদন্তের স্বচ্ছতা, গুরুত্বপূর্ণ আলামতের যথাযথ সংরক্ষণ, সিসি ক্যামেরার তথ্য বিশ্লেষণ এবং হত্যার প্রকৃত মোটিভ দ্রুত উদ্ঘাটনের প্রত্যাশাই কাজ করছে বলে জানা গেছে।
মিতালী-১১১ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে বা কারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে এবং ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে আসলে কারা উপস্থিত ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তদন্তে। আর সেই উত্তর যত দেরিতে মিলবে, ততই বাড়বে নানা জল্পনা-কল্পনা। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কর্মকর্তা বাবুল মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে কী তথ্য বের করতে পারেন এবং তদন্তের পরবর্তী ধাপে সিসিটিভি, ফরেনসিক আলামত, সুরতহাল ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হয়।