সুনির্মল সেন: সিলেট সিটি কর্পোরেশনে (সিসিক) বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬ কার্যক্রমে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে নগরবাসী ও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নগরবাসী।
সম্প্রতি ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় ২২ জুলাই। আবেদনের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ জুলাই। প্রথমে সাক্ষাৎকার ও ব্যবহারিক পরীক্ষা ২৬ জুলাই সকাল ১০টায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৬ষ্ঠ তলার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করে ২৯ জুলাই নির্ধারণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ৩ আগস্ট একই স্থানে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এবং সিলেট শহরে অবস্থিত সমাজসেবা অফিসের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসংগতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সিলেট বিভাগের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, জাফলং, দক্ষিণ সুরমা ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সুপারিশ ও ব্যক্তিগত প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ সহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিবাদ ও আন্দোলনের খবরও পাওয়া গেছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্রে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে কয়েকজন অভিযোগকারী দাবি করেছেন, সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের একটি অংশ ফ্যামিলি কার্ড শুমারির কাজে নিয়োগ পেয়েছেন। এতে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পরীক্ষার্থী।
নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার অভিযোগ
৩ আগস্ট দুপুর ৩টার দিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও ওই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. কবির আহমেদ দলীয় কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে নিয়োগস্থলে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তিনি নিজ ওয়ার্ডের কয়েকজন দলীয় সমর্থককে পরীক্ষার পর তাদের নাম ও রোল নম্বর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন এবং নিয়োগের বিষয়ে তদবির করবেন বলে জানান। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. কবির আহমেদের ব্যাক্তিগত মোঠোফোনো যোগাযগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, বিকেল ৪টার দিকে ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে ওই এলাকার আরেক বিএনপি নেতার পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি দাবি করেন, ওই নেতা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ফাস্টফুড খাওয়ান।
এসব ঘটনায় নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন পরীক্ষার্থী। তাঁদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব থাকলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন
ফ্যামেলী কার্ড শুমারি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচি। এই কর্মসূচির জন্য তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজন হলে স্বচ্ছতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থী ও নগরবাসীর একটি অংশ। এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।