প্রেমের শেষ পরিণতি এখন ফুটপাতে চা বিক্রি! জান্নাতের জীবনকাহিনী হার মানাবে সিনেমার গল্পকে।
প্রেমের শেষ পরিণতি এখন ফুটপাতে চা বিক্রি! জান্নাতের জীবনকাহিনী হার মানাবে সিনেমার গল্পকে।
admin
প্রকাশিত ০৭ আগস্ট, শুক্রবার, ২০২৬ ১৪:৩৮:৩২
প্রেমের শেষ পরিণতি এখন ফুটপাতে চা বিক্রি! জান্নাতের জীবনকাহিনী হার মানাবে সিনেমার গল্পকে
অনলাইন ডেক্স|”প্রেম করে কেউ কোনোদিন বিয়ে করবেন না। প্রেম করে বিয়ে করবেন তো আমার মতো আজকে পস্তাতে হবে। কেউ ওপারে চলে যাবে, আর কাউকে রাস্তায় নামতে হবে। যেমন আমি রাস্তায় নামছি…”—ভেজা চোখে, বুকফাটা কান্না চেপে ক্যামেরার সামনে কথাগুলো বলছিলেন জান্নাত। ঢাকার আগারগাঁওয়ের ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে তার জীবনের এই নির্মম সত্য প্রকাশ করার সময় তার চোখ বেয়ে নামছিল অশ্রুধারা।
জান্নাতের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন কেবলই সংগ্রাম আর বেদনার রঙে লেখা। তার এই জীবনকাহিনী কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়।
জান্নাতের জীবনের কষ্টের শুরু খুব ছোটবেলা থেকেই। শৈশবেই তিনি হারিয়েছেন তার বাবা-কে। পিতৃছায়াহীন জান্নাত বড় হয়েছেন একটি এতিমখানায়। সেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। খেয়ে না-খেয়ে বড় হওয়া এই মেয়েটির জীবনে কোনো স্থায়ী সুখের আশ্রয় ছিল না। তবুও বুকভরা আশা নিয়ে তিনি সুন্দর একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
পারিবারিক সমস্যার কারণে জান্নাতের প্রথম সংসারটি টেকেনি। সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর তার জীবনে পরিচয় হয় অন্য আরেকজনের সাথে। প্রায় তিন বছরের ভালোবাসার সম্পর্কের পর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জান্নাত ভেবেছিলেন, হয়তো এবার তার জীবনে একটু সুখের দেখা মিলবে। স্বামী তার অতীত, বর্তমান, ভালো-মন্দ সবকিছুই জানতেন। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! সবকিছু জানার পরও সেই স্বামী জান্নাতের সাথে এক বিশাল প্রতারণা করেন।
জান্নাতের ভাষায়, স্বামী তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে এবং এমন এক অবস্থায় ফেলে যায় যা তাকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। এই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সইতে না পেরে এবং কোনো আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা না পেয়ে চরম হতাশায় দুই মাস আগে তিনি বরিশালের আশুকাঠি হাসপাতালে চিকিৎসাধীনও ছিলেন। কোনো উপায় না পেয়ে একসময় আত্মাহুতির পথও বেছে নিতে চেয়েছিলেন তিনি।
নিজের সন্তান আর বৃদ্ধ মায়ের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে জান্নাত সব বাধা উপেক্ষা করে নেমে পড়েছেন জীবন যুদ্ধে। ঢাকার আগারগাঁওয়ের নতুন রাস্তায়, পরিসংখ্যান ভবনের পাশে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি ছোট্ট চায়ের দোকান, যার নাম দিয়েছেন ‘জান্নাত টি স্টল’।
এখানে তিনি লেবু চা, তেঁতুল চা, মালাই চা, গরুর দুধের চা, পুদিনা চা, দুধ ডেনিশ, পোড়া রুটি, দই-চিঁড়া এবং চিঁড়া-নারকেলের মতো নানারকম খাবার বিক্রি করেন। মাত্র এক মাস হলো তিনি এই দোকানটি দিয়েছেন। কিন্তু এই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সম্মানজনক উপার্জনের পথও তার জন্য মসৃণ নয়।
জান্নাত কাঁদতে কাঁদতে জানান, এই এক মাসের মধ্যে এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন মানুষ তাকে নিয়ে বাজে কথা বলেনি। সততার সাথে খেটে খাওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত তাকে মানুষের কটূক্তি আর উপহাসের শিকার হতে হয়। কেউ তাকে হাসির পাত্র বানায়, কেউবা করে অপমান। কিন্তু জান্নাত কারো সাহায্য চান না, ভিক্ষা চান না। তিনি চান কেবল সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার একটু সুযোগ।
নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জান্নাত তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে একটি আকুল অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাবা-মা যেমনই হোক—কানা, খোঁড়া বা লুলা—তাদের পছন্দেই যেন সবাই বিয়ে করে। অন্তত দিনশেষে কোনো সমস্যায় পড়লে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো যায়, মনের কথা বলা যায়। জান্নাত প্রেম করে বিয়ে করে আজ এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন যে, তিনি চাইলেও তার মায়ের কাছে কিংবা গ্রামবাসীর কাছে মুখ দেখাতে পারেন না।
সব কষ্ট, অপমান আর চোখের জল আড়াল করে জান্নাত এখনো হাল ছাড়েননি। তার দৃঢ় বিশ্বাস, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সমাজের হাজারো কটূক্তি পেছনে ফেলে সন্তান আর বৃদ্ধ মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে আগারগাঁওয়ের ফুটপাতে প্রতিদিন ভোর হয় জান্নাতের এক নতুন যুদ্ধের গল্প নিয়ে।