আন্তর্জাতিক ডেস্ক | দক্ষিণ লেবানন তারিখ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
দক্ষিণ লেবাননের সাত বছর বয়সী শিশু এলিন সাঈদ। ইসরায়েলি হামলায় নিহত বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে পরিবারের সঙ্গে গিয়েছিল সে। কিন্তু কে জানত, বাবার কফিনের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই যমদূত হয়ে আবারও ফিরবে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। বাবাকে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথে দ্বিতীয় দফা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে এলিনের মাত্র ১৮ মাস বয়সী ছোট বোন তালিন। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তালিনের জন্মও হয়েছিল তখন; সেই যুদ্ধের আগুনেই শেষ হলো তার ছোট্ট জীবন।
‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতির দিনে ভয়াবহতা
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে যখন লেবানিজরা শান্তির আশা করছিল, তখনই দক্ষিণ লেবাননের স্রিফা গ্রামে নেমে আসে বিপর্যয়। এদিন ইসরায়েলি হামলায় লেবাননজুড়ে অন্তত ৩৫০ জন নিহত হন। এলিন সাঈদের পরিবার থেকেই ঝরে যায় চারটি প্রাণ।
বেঁচে যাওয়া এলিনের ৬৪ বছর বয়সী দাদা নাসের সাঈদ যন্ত্রণার সুরে বলেন:
“সবাই বলছিল যুদ্ধবিরতি হয়েছে। আমরাও অন্যদের মতো গ্রামে গিয়েছিলাম। কফিনের পাশে দোয়া পড়ে মাত্র বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছি, তখনই মনে হলো যেন আমাদের ওপর ঝড় নেমে এল।”
ছোট্ট কফিনে বড় শোক
মাথায় ও হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে নাসের সাঈদ যখন সবুজ কাপড়ে মোড়ানো স্বজনদের মরদেহ নিতে আসেন, তখন সবার চোখ আটকে যায় একটি অতি ক্ষুদ্র কফিনে। সেটি ছিল ছোট্ট নাতনি তালিনের। ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের আবহে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল সংঘাতের সময় জন্ম নেওয়া এই শিশুটি তার পুরো জীবনই কাটিয়েছে যুদ্ধের সাইরেন শুনে। তালিনের নানা মোহাম্মদ নাজ্জাল বলেন, “সে যুদ্ধেই জন্মেছিল, যুদ্ধেই মারা গেল।”
বর্তমানে এলিন সাঈদ এবং তার মা গিনওয়া রক্তাক্ত ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় টায়ার শহরের জাবাল আমেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নাসের সাঈদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটি কোনো মানবতা নয়, এটি যুদ্ধাপরাধ। ইসরায়েলের একটি শিশু আহত হলে সারা বিশ্ব কেঁপে ওঠে। আমরা কি মানুষ নই?”
বিপর্যয়ের মুখে স্বাস্থ্যসেবা
টায়ারের জাবাল আমেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান ডা. আব্বাস আত্তিয়াহ জানান, গত সপ্তাহের বোমাবর্ষণ ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ভয়াবহতম। হাসপাতালে আসা রোগীদের বিশাল অংশই শিশু। তিনি বলেন, “আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাত্র ৩০ বা ৬০ মিনিটের ব্যবধানে আসা বিপুল সংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসা দেওয়া।”
সংঘাতের পরিসংখ্যান
গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের এই নতুন পর্যায়ে ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬৫ শিশু এবং ২৫০ জন নারী রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চললেও লেবাননের ভাগ্যে এখনো শান্তি জোটেনি। গত শনিবারও সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০০ জন।
ইসরায়েলি বাহিনী এই নির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই বলে জানালেও তাদের দাবি, তারা কেবল হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেই হামলা চালায়। তবে এলিন ও তালিনের মতো শত শত শিশুর রক্তমাখা পোশাক ভিন্ন এক সংকটের গল্প বলছে।