বারুদ ডেস্ক :: সিলেটের গোয়াইনঘাটে নদী যেন এখন আর নদী নেই—পরিণত হয়েছে কথিত একটি শক্তিশালী বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটের ‘খোলা খনি’তে। সরকারি ইজারার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে পিয়াইন, ডাউকি ও আশপাশের নদ-নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় চলছে অবাধ বালু ও পাথর উত্তোলন। দিন-রাতের কোনো বাছবিচার নেই। সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রেজার, বোমা মেশিন ও এক্সকাভেটর। অভিযোগ উঠেছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে কোটি কোটি টাকার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কথিত এই সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় নদী লুটের পাশাপাশি চলছে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ইজারা শর্ত লঙ্ঘন এবং পরিবেশ ধ্বংসের ভয়াবহ প্রতিযোগিতা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—জেলা প্রশাসনের ইজারা চুক্তিতে গোয়াইনঘাটে বালুমহালের পরিমাণ মাত্র ৮৮ দশমিক ৭৮ একর। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারার সীমা ছাড়িয়ে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদীপথে। কারা দিচ্ছে এই অবৈধ উত্তোলনের অনুমতি? কারা ভাগ নিচ্ছে কোটি টাকার এই বাণিজ্যের? আর প্রশাসনের চোখের সামনে বছরের পর বছর এই নদী লুটপাট চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গোয়াইনঘাটবাসীর মুখে মুখে। ইজারা এক জায়গায়, বালু উত্তোলন পুরো নদীপথে!
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার হাজিপুর, প্রতাপুর, আহারকান্দি, লুনি ও কন্যাজঙ্গলসহ বিভিন্ন নদী এলাকায় অবাধে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। ইজারা শর্ত অনুযায়ী দিনের বেলায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে দাবি স্থানীয়দের। রাত নামলেই নদীতে সক্রিয় হয়ে ওঠে ড্রেজার ও বোমা মেশিন। কোথাও আবার এক্সকাভেটর দিয়ে নদীর বুক ও তীর কেটে তোলা হচ্ছে বালু-পাথর। এইসব অবৈধ কার্যক্রমের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে এবং তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন।
স্থানীয় নাগরিকদের দাবি, পিয়াইন ও ডাউকি নদীর তীরবর্তী অন্তত তিন কিলোমিটার এলাকায় ইতোমধ্যে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিতে পড়েছে বসতবাড়ি, মসজিদ, খেলার মাঠ, কবরস্থান ও সরকারি রাস্তাঘাট। ইজারার শর্তে বিভিন্ন নিষেধাঞ্জা থাকলেও বাস্তবে চলছে তারই উল্টো! ইজারা চুক্তির ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর শর্ত অনুযায়ী ড্রেজার বা পাম্প ব্যবহার, রাতে বালু উত্তোলন, নদীর তীর ও আবাসিক এলাকার ক্ষতি এবং উপ-ইজারা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকার কথা।
অভিযোগকারীদের দাবি, ‘মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। কথিত এই সিন্ডিকেটে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের অন্তত ৪৩ জন রাজনৈতিক নেতাকে অংশীদার করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ এই প্রতিনিধির হাতে আসেনি,সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
যদি এমন অভিযোগ সত্য হয় তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়! একটি সরকারি বালুমহালের ইজারা কি আদৌ এত বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে? বালু পরিবহনকারী ট্রাক ও নৌকা থেকে নির্ধারিত রয়্যালটির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যেখানে নির্ধারিত মূল্য ১ টাকা ৭১ পয়সা, সেখানে ট্রাক ও নৌকা থেকে ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে এই অর্থ আদায়ের প্রকৃত পরিমাণ, কারা আদায় করছে এবং এর কোনো বৈধ হিসাব রয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি রাখে।
গোয়াইনঘাটের বালু উত্তোলনকে ঘিরে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে– প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কথিত সাংবাদিকদের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করার নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের। অভিযোগকারীদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্ন রাখতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়মিত অর্থ দেওয়া হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে।এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাইয়ের তারিখযুক্ত একটি কথিত তালিকা ফাঁস হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তালিকায় সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নামে প্রতি সপ্তাহে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার হিসাব রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের সূত্র মতে কথিত ওই তালিকায়- সিলেট জিন্দাবাজার প্রেসক্লাবের নামে সপ্তাহে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা; সুবিদবাজার প্রেসক্লাব -এর নামে ৩ লাখ টাকা;ইমজার নামে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা;অনলাইন প্রেসক্লাবের নামে ৮০ হাজার টাকা; সিলেটের গোয়াইনঘাটের ২৬৮ জন সাংবাদিকের নামে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা; ৭জন টেলিভিশন সাংবাদিকের নামে ৮০ হাজার টাকা;কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকদের নামে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এছাড়া আরও কয়েকজন ব্যক্তির নামে পৃথক অর্থ বরাদ্দ এবং ‘বলদ’ কোডনামে কয়েকটি খাতের উল্লেখ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে কথিত তালিকাটির সত্যতা, অর্থ লেনদেনের বাস্তবতা এবং তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যদি তালিকাটি সত্য হয় তাহলে এটি শুধু বালু উত্তোলনের অনিয়ম নয়—বরং একটি সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত বহন করে। আর যদি তালিকাটি মিথ্যা হয়, তাহলে কারা এই তালিকা তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে—সেটিও তদন্ত হওয়া জরুরি।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে-মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ড্রেজার ও বোমা মেশিন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠেছে—মেশিন পোড়ালেই কি নদী লুট বন্ধ হয়?
অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হলেও কথিত মূল নিয়ন্ত্রক বা অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা আজও নেওয়া হয় না। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবারও নদীতে নামে নতুন মেশিন।
এদিকে,বালুমহালের সীমানা যথাযথভাবে পতাকা টাঙিয়ে নির্ধারণ না করার অভিযোগ উঠেছে ইউএনও রতন কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধে। এখানে প্রাক্তন ওসি ও সেকেন্ড অফিসার এসআই ফয়েজের বিরুদ্ধে মাসোহারা ও বখরা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিনিধির হাতে নেই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।পরবর্তীতে নতুন ওসি হিসেবে ওমর ফারুক দায়িত্ব নেওয়ার পরও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
প্রশাসনের কোনো অংশের নীরবতা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের সাহস জোগাচ্ছে? উচ্চ আদালতে রিট, মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি—তবুও থামছে না নদী লুট অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উচ্চ আদালতে রিট এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা হিফজুর রহমান খান।স্থানীয় ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকেও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দেওয়ার কথা জানা গেছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, একের পর এক অভিযোগের পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। ফলে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
গোয়াইনঘাটের নদ-নদী শুধু বালুর উৎস নয়। এগুলো এলাকার পরিবেশ, কৃষি, যোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কিন্তু অবাধে বালু-পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীরভাঙন, বসতবাড়ি ও স্থাপনা বিলীন হওয়া এবং পরিবেশগত বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এখন সময় এসেছে গোয়াইনঘাটের বালুমহাল নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার।
একদিকে নদী ভাঙছে, অন্যদিকে ফুলে-ফেঁপে উঠছে কথিত সিন্ডিকেটের অর্থের পাহাড়—এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে এটি শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়; এটি সরকারি সম্পদ লুটের একটি ভয়াবহ চিত্র। এখন দেখার বিষয়—গোয়াইনঘাটের নদী রক্ষায় প্রশাসন সত্যিই কঠোর হবে, নাকি নদীর বুক চিরে চলা এই কথিত ‘বালু সাম্রাজ্য’ আরও বিস্তৃত হবে।