নিজস্ব প্রতিবেদক, রায়পুরা (নরসিংদী) ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
রোগী আসছেন ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিতে, আর সিরিয়ালের অপেক্ষার ফাঁকে বুঁদ হয়ে থাকছেন বইয়ের পাতায়। একই ছাদের নিচে চিকিৎসাসেবা আর জ্ঞানচর্চার এমন এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর নগর গ্রামে। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. ফরহাদ আহমেদের প্রতিষ্ঠিত ‘ফার্মেসি পাঠাগার’ এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মামার স্মৃতি ও সাহিত্যপ্রেমের সমন্বয়
চলতি বছরের জানুয়ারিতে উপজেলার মিনা মার্কেটে এই পাঠাগারটির যাত্রা শুরু। ফরহাদ আহমেদ জানান, তাঁর এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর মামা, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ‘বাদশা’ খ্যাত কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের স্মৃতি। শৈশব থেকেই মামার সান্নিধ্যে বড় হওয়া ফরহাদের ভেতরে যে সাহিত্যের বীজ বপন হয়েছিল, আজ তাই এই পাঠাগারের রূপ নিয়েছে।
ওষুধের আলমারিতে জ্ঞানের রসদ
ফার্মেসিটিতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পাশাপাশি তাকে তাকে সাজানো রয়েছে স্বাস্থ্য, ধর্ম, ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং কালজয়ী সব সাহিত্যের বই। রোগীরা যখন চিকিৎসার জন্য সিরিয়াল দেন, তখন হাতে থাকা অলস সময়টুকু তারা পার করছেন বই পড়ে। শুধু রোগীই নন, স্থানীয় তরুণ ও সাধারণ মানুষও এখানে নিয়মিত বই পড়তে আসেন। অনেকে আবার বাড়িতেও বই নিয়ে যান।
তরুণ প্রজন্মকে ফেরানোর হাতিয়ার
বর্তমান সময়ে মোবাইল আসক্তি এবং মাদকের নীল দংশন থেকে তরুণদের দূরে সরাতে এই পাঠাগারটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা মুকারম হোসেন ও পাঠক তনয় জানান, চিকিৎসা নিতে এসে বই পড়ার এমন সুযোগ সত্যিই বিরল। এটি সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এক বহুমাত্রিক চিকিৎসক
মো. ফরহাদ আহমেদ কেবল একজন চিকিৎসকই নন, তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ লেখকও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ফরহাদের ইতোমধ্যে ১৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে ‘আমার দেখা কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ’ ও ‘নিভে যায় নক্ষত্র’ উল্লেখযোগ্য। তিল তিল করে গড়ে তোলা এই পাঠাগার স্থাপনে তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন তাঁর স্ত্রী নিপা বেগম।
উদ্যোক্তার স্বপ্ন
নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে ফরহাদ আহমেদ বলেন, “বই মানুষকে আলোকিত করে। শৈশব থেকেই মামার কাছে শেখা সেই জ্ঞান মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেই এই প্রচেষ্টা। তরুণদের মোবাইল থেকে সরিয়ে বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনাই আমার মূল লক্ষ্য। আমি চাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদেও সমৃদ্ধ হোক।”
রায়পুরার এই ‘ফার্মেসি পাঠাগার’ প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে গ্রামীণ প্রান্তিক জনপদেও জ্ঞানের আলো জ্বালানো সম্ভব। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ফরহাদ আহমেদের এই মডেল সারা দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।