এবারের এইচএসসি ফলাফল ও কিছু তিক্ত সত্য: শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে
এবারের এইচএসসি ফলাফল ও কিছু তিক্ত সত্য: শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে
admin
প্রকাশিত ০১ নভেম্বর, রবিবার, ২০২৬ ১৮:৫৭:২৩
এবারের এইচএসসি ফলাফল ও কিছু তিক্ত সত্য: শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে এই ব্যাচকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করছেন, কেউ আবার শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিকে সামনে আনছেন। তবে আমার বিবেচনায়, এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করে কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। বরং আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বিগত কয়েক বছরের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে, খুঁজে দেখতে হবে কোথায় আমাদের ভুল ছিল, কীভাবে সেই ভুলের প্রভাব আজকের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রথমেই ধন্যবাদ জানাতে চাই বিএনপি সরকারকে—শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য। শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ফলাফলের পরিসংখ্যানের চেয়ে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষার মান নিয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই।
করোনার অভিঘাত ও শিক্ষার ভিত্তিতে ফাটল
করোনাভাইরাস মহামারি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব সংকট সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, আর্থসামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠচর্চার অভাবে শিক্ষার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখতে অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং সীমিত পরিসরে মূল্যায়নের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে মানবিক ও বাস্তবিক বিবেচনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর এর কী প্রভাব পড়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একটি শ্রেণির পাঠ্যসূচি যথাযথভাবে আয়ত্ত না করেই পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে শেখার ঘাটতি পরবর্তী শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অতীতের পরীক্ষার ফলাফলে উচ্চ পাসের হার কিংবা বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ অর্জন শিক্ষার প্রকৃত মানের একমাত্র নির্ণায়ক হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও যদি তার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকে, তাহলে সেই ফলাফল দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
ফলাফলের আড়ালে যে বাস্তবতা এবারের ফলাফল আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমাদের শিক্ষার্থীরা কি সত্যিকার অর্থে শিখছে, নাকি কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে?
হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকলেও নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে তাদের উপস্থিতি কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? পাঠদান, পাঠগ্রহণ, বাড়ির কাজ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ—এসবের যথাযথ সমন্বয় ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর লেখার বিষয় নয়। শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জন, চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি, যুক্তিবোধের বিকাশ এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করা।
অতএব, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, শিক্ষকের আন্তরিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীর দায়িত্বশীল অধ্যয়ন—এই তিনটি বিষয়কে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে শুধু উপস্থিতি নয়, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
নিয়মিত পড়াশোনা করলে কি কেউ ফেল করবে?
আমার বিশ্বাস, একজন শিক্ষার্থী যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকে, শিক্ষকের পাঠ মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করে, বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করে এবং নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলে তার পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে কমে যায়।
তবে বাস্তবতা হলো, সব শিক্ষার্থীর মেধা, শেখার গতি, পারিবারিক পরিবেশ ও আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। কারও শেখার জন্য বাড়তি সময় প্রয়োজন হতে পারে, কারও প্রয়োজন হতে পারে বিশেষ সহায়তা। তাই শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য কেবল তাদের ব্যক্তিগত অবহেলাকে দায়ী না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্বও বিবেচনা করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়লে তাকে অবহেলা নয়, বরং আরও বেশি যত্ন ও সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কাউকে বাদ দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেককে শেখার সুযোগ করে দেওয়া।
ফেল করা মানেই জীবনের পরাজয় নয় যারা এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারেনি, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই—মন খারাপ করো না। একটি পরীক্ষার ফলাফল তোমার পুরো জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না।
জীবনে সফল হওয়ার জন্য ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র শর্ত নয়। অধ্যবসায়, সততা, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতাও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল মানুষের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে তাঁরা শেষ পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং নতুন করে শুরু করার প্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।
তোমরাও নিজেদের ভুলগুলো চিহ্নিত করো। কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, কোথায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল, কেন প্রত্যাশিত ফলাফল আসেনি—সেগুলো খুঁজে বের করো। এরপর নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
শোনা যাচ্ছে, যারা এবারের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এমন সুযোগ বাস্তবায়িত হলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত উদ্যোগ
শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পাঠদানের মান উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে নিয়মিত শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন, বিষয়ভিত্তিক অতিরিক্ত পাঠদান, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শুধু পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। যারা পিছিয়ে পড়েছে, তাদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাও শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; কোনো একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাতারাতি এর পরিবর্তন সম্ভব নয়।
শেষ কথা এবারের এইচএসসি ফলাফলকে আমি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে চাই। এই ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত করতে হলে কৃত্রিম সাফল্যের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
পাসের হার বেশি হলেই শিক্ষাব্যবস্থা সফল হয় না, জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়লেই জাতি মেধাবী হয়ে ওঠে না। একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই সফল, যখন শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করে, নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তোলে এবং সেই জ্ঞানকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে।
আমরা চাই না, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করুক। আমরা চাই, তারা প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হোক। আমরা চাই, তারা আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক।
তাই এবারের ফলাফল নিয়ে হতাশ না হয়ে আমাদের উচিত শিক্ষার মানোন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করা। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
মনে রাখতে হবে, পরীক্ষার ফলাফল জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র, পুরো জীবন নয়। আজ যারা ব্যর্থ হয়েছে, আগামীকাল তারাই হয়তো নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
সামনে সুদিন আসুক। শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি হোক নতুন সম্ভাবনার পথ।
লেখক: প্রফেসর শাহ আলম তালুকদার তুহিন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী, প্রভাষক ও টিভি-রেডিও উপস্থাপক (আরজে)- ইংরেজি প্রভাষক, বিশ্বনাথ সরকারি ডিগ্রি কলেজ, বিশ্বনাথ, সিলেট।