মিতালী-১১১ ট্রিপল মার্ডার: ১৬৪-এর জবানবন্দিতে কি মিলছে ঘটনার আলামত?
মিতালী-১১১ ট্রিপল মার্ডার: ১৬৪-এর জবানবন্দিতে কি মিলছে ঘটনার আলামত?
admin
প্রকাশিত ২৯ আগস্ট, শনিবার, ২০২৬ ১৬:০৮:১১
প্রেম থেকে চুরি—বারবার বদলেছে হত্যার ‘মোটিভ’, অক্ষত টাকা-স্বর্ণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | সিলেট : সিলেট নগরীর রায়নগরের মিতালী-১১১। ১২ আগস্ট সকালে এই বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে উদ্ধার হয় তিনটি মরদেহ। নিহত আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সিলেটজুড়ে তৈরি হয় তীব্র চাঞ্চল্য।
ঘটনার পরপরই আটক করা হয় রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়াকে। চার দিনের রিমান্ড শেষে ২০ আগস্ট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। পুলিশ জানায়, জবানবন্দিতে বাবুল নিজেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত করেছেন। তবে জবানবন্দির বিস্তারিত আদালতের খাস কামরা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পুলিশের বরাত দিয়ে যে তথ্য সামনে আসে, তাতে হত্যার কারণ হিসেবে উঠে আসে বাসাভাড়ার টাকা জোগাড়ের জন্য চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে একের পর এক প্রশ্ন।
প্রথম প্রশ্ন: হত্যার ‘মোটিভ’ কেন বারবার বদলাল?
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের বক্তব্যে প্রথমে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের কথিত প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। পরবর্তীতে খারাপ ব্যবহারের কারণে হত্যার কথা বলা হয়। সর্বশেষ সামনে আসে—চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ায় তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে।
একই হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্তের শুরুতেই যদি একাধিক ভিন্ন মোটিভ সামনে আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কোন তথ্যটি তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত, আর কোনটি কেবল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য?
সাম্প্রতিক মানববন্ধনেও নিহত পরিবারের সদস্যরা পুলিশের বক্তব্যে এই পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: চুরিই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে গেল কোথায় টাকা-স্বর্ণ?
এটাই এখন মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।
নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর বাসায় থাকা নগদ ৬৮ হাজার টাকা, পাউন্ড, ডলার ও স্বর্ণালংকার খোয়া যায়নি।
অর্থাৎ, যদি হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে চুরি করে বাসাভাড়ার টাকা জোগাড় করা, তাহলে তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশের পর মূল্যবান অর্থ ও স্বর্ণালংকার অক্ষত থাকার ব্যাখ্যা কী?
এটি কোনোভাবেই একা বাবুলের নির্দোষতা প্রমাণ করে না। কিন্তু চুরির উদ্দেশ্যকে হত্যার প্রধান মোটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই বিষয়টির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তৃতীয় প্রশ্ন: ক্রাইম সিন কী বলছে?
একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু জবানবন্দি নয়—ক্রাইম সিন, ফরেনসিক আলামত, রক্তের দাগ, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, অস্ত্র, সিসিটিভি, মোবাইল ফোনের অবস্থান, কল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য—সবকিছুকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
তাই প্রশ্ন হলো—
বাবুলের ১৬৪ ধারার বক্তব্যের প্রতিটি অংশ কি ক্রাইম সিনের আলামতের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে?
তিনি যে সময়ে, যে পথে এবং যেভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা বলেছেন—সেটি কি সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ডাটা, ফরেনসিক রিপোর্ট ও অন্যান্য আলামত দিয়ে যাচাই করা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে জবানবন্দিটি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চতুর্থ প্রশ্ন: একজনের পক্ষে পুরো হত্যাকাণ্ড?
পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়েছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। মামলার এজাহারেও জমিসংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগের কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বাবুলের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে এককভাবে হত্যার একটি বর্ণনা সামনে এসেছে।
এখন তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
তিনজন মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা, ঘটনাস্থলে চলাচল, হত্যার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় বাবুল একাই ছিলেন—নাকি অন্য কারও উপস্থিতি বা সহযোগিতার কোনো আলামত রয়েছে?
এটি অনুমানের বিষয় নয়; ক্রাইম সিন ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার বিষয়।
পঞ্চম প্রশ্ন: ‘বড় হাত’—নাকি একক হত্যাকারী?
নিহত পরিবারের সদস্যরা বারবার বলে আসছেন, তারা মনে করেন হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় কোনো বিষয় থাকতে পারে। মানববন্ধনেও তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী না করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তের দাবি জানিয়েছেন।
এখানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো—কাউকে আগেভাগে খুনি ঘোষণা না করা; আবার কোনো সম্ভাবনাকেও শুধু একটি জবানবন্দির কারণে বাদ না দেওয়া।
কারণ আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলেও তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো সেটিকে অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
তদন্তে এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
মিতালী-১১১ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারীদের সামনে অন্তত কয়েকটি প্রশ্ন এখন স্পষ্ট—
১. বাসায় থাকা নগদ টাকা, পাউন্ড, ডলার ও স্বর্ণালংকার যদি অক্ষত থাকে, তাহলে চুরির মোটিভ কতটা শক্তিশালী?
২. পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে প্রেম, খারাপ ব্যবহার এবং পরবর্তীতে চুরির মতো ভিন্ন ভিন্ন মোটিভ কেন সামনে এসেছে?
৩. বাবুলের ১৬৪ ধারার বক্তব্যের সঙ্গে ক্রাইম সিনের প্রতিটি আলামত কি মিলে যায়?
৪. হত্যাকাণ্ডের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল লোকেশন কী বলছে?
৫. হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা কী ফল দিয়েছে?
৬. ঘটনাস্থলে বাবুল ছাড়া অন্য কারও ডিএনএ, আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না?
৭. নিহত পরিবারের করা জমিসংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগ তদন্তে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
৮. হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে কারা নিহতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল—কল ডিটেইলস ও ডিজিটাল ফরেনসিকসে তার কোনো সূত্র মিলেছে কি না?
মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—তদন্ত কোন পথে?
ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর শুক্রবার শাহী ঈদগাহ এলাকায় নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী মানববন্ধন করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তন এবং তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকার অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। তিন দিনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানববন্ধনকারীরা কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার দাবি করেননি; বরং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এটাই তদন্তের মূল কথা হওয়া উচিত।
মিতালী-১১১-এর তিনটি প্রাণহানি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এখানে একটি জবানবন্দি দিয়ে তদন্ত শেষ করার সুযোগ নেই। বরং জবানবন্দির প্রতিটি বক্তব্যকে ক্রাইম সিন, ফরেনসিক, সিসিটিভি, ডিজিটাল তথ্য ও অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘বাবুল কি জড়িত?’—এতটুকু নয়।
প্রশ্ন হলো—
এই হত্যাকাণ্ডের পুরো সত্য কী?
আর সেই সত্য যদি জবানবন্দির সঙ্গে মিলে যায়, প্রমাণ দিয়ে সেটি প্রতিষ্ঠিত হোক। আর যদি কোথাও অমিল থাকে, তাহলে সেই অমিলের পেছনের সত্যটিও বেরিয়ে আসুক।
তিনটি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্তকে কোনো নির্দিষ্ট গল্পের সঙ্গে নয়—আলামত ও সত্যের সঙ্গে মিলিয়েই এগোতে হবে।
ডিবির অভিযানে ৩৩ বোতল মদ জব্দ, গ্রেপ্তার ২; পলাতক ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা
সিলেট মহানগর প্রতিনিধি:: সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এয়ারপোর্ট থানাধীন তারাপুর চা-বাগান এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করেছে। এ সময় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় আরও তিনজনকে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন লাক্কাতুরা চা-বাগান এলাকার দুলাল দাস (৩৫) ও মিঠুন গোয়ালা (২৭)। মামলার পলাতক আসামিরা হলেন তারাপুর এলাকার সুনিল মুদি, রাখাল (২৮) ও লিমন (২৫)।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল এয়ারপোর্ট থানাধীন তারাপুর চা-বাগানের জাহাঙ্গীর নগরের পেছনের টিলা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি বস্তাভর্তি মদ নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করে। ধাওয়া করে দুলাল দাস ও মিঠুন গোয়ালাকে আটক করা হলেও তাদের সঙ্গে থাকা অপর তিনজন পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে আটক ব্যক্তিদের দেহ ও সঙ্গে থাকা বস্তা তল্লাশি করে দুলাল দাসের কাছ থেকে ২০ বোতল এবং মিঠুন গোয়ালার কাছ থেকে ১৩ বোতলসহ মোট ৩৩ বোতল CAREW’S Country Liquor উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বোতলে ১ হাজার মিলিলিটার করে মদ ছিল। জব্দকৃত মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৩ হাজার টাকা।
পুলিশ জানায়, উদ্ধারকৃত সব বোতলের সিল ও প্লাস্টিকের ছিপি অক্ষত অবস্থায় ছিল। ঘটনাস্থলেই জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে আলামত জব্দ করা হয় এবং সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, তারা লাক্কাতুরা চা-বাগান এলাকা থেকে মদ সংগ্রহ করে সিলেট শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির উদ্দেশ্যে বহন করছিল। একই সঙ্গে তারা পলাতক তিন সহযোগীর পরিচয়ও প্রকাশ করে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত দুলাল দাস ও মিঠুন গোয়ালা এবং পলাতক সুনিল মুদি, রাখাল ও লিমনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারার টেবিল ২৪(খ)/৪১ ধারায় এয়ারপোর্ট থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।