২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৯ মাসে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ৯৭৯ নারী কর্মী, নির্যাতনের অভিযোগে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন?

admin
প্রকাশিত ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০২৬ ১৭:০১:৩১
৯ মাসে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ৯৭৯ নারী কর্মী, নির্যাতনের অভিযোগে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন?

প্রবাসে স্বপ্নভঙ্গ, দেশে ফিরে অনিশ্চয়তা—নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে!

 

বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁরা। কারও লক্ষ্য ছিল পরিবারের অভাব ঘোচানো, কারও স্বপ্ন সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া, আবার কেউ চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে যদি জোটে নির্যাতন, বন্দিদশা ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, তাহলে সেই দায় কার?

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—মাত্র নয় মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী। তাঁদের মধ্যে ৯৭৯ জনই সৌদি আরব থেকে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস-সংক্রান্ত তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই পরিসংখ্যান। তবে দেশে ফেরা সব নারী কর্মীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

সংখ্যাটি শুধু প্রত্যাবর্তনের হিসাব নয়; এটি বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা, নিয়োগব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ এবং অভিযোগের প্রতিকার নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধানের দাবি জানায়।

‘বন্দিজীবন’ থেকে দেশে ফেরা

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাভারের শিলা বেগম ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। পরিবারের খরচ জোগানোর আশায় বিদেশে গেলেও এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে দেশে ফিরতে হয়।

শিলার অভিযোগ, তাঁকে দীর্ঘ সময় কাজ করানো হতো, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ মিলত না। এমনকি রান্নাঘরে ঘুমাতে হতো এবং বাড়ির বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতাও সীমিত ছিল। পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দোহারের জাহানারা বেগমের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। প্রকাশিত সংবাদে তাঁর অভিযোগ, সৌদি আরবে নিয়োগকর্তার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রত্যাশায় বিদেশে যাওয়া এই নারী শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

শিলা ও জাহানারার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত অভিযোগ হলেও এগুলো বিদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। কর্মীর শ্রমঘণ্টা, বিশ্রাম, খাবার, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর সুযোগ—এসব বিষয়ে কার্যকর সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ: প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ?

বিদেশ থেকে দেশে ফেরা কিছু নারী কর্মীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগের কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব, কোথাও তা প্রত্যাখ্যানের পর নির্যাতনের অভিযোগ—এসব ঘটনা নারী কর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

তবে সৌদি আরব থেকে ফেরা ৯৭৯ নারী কর্মীর অধিকাংশই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁদের কেউই বিচার পাননি—এমন দাবির পক্ষেও পূর্ণাঙ্গ মামলা, তদন্ত ও আদালতের রেকর্ড প্রয়োজন।

অভিযোগের সংখ্যা কত, তদন্ত হয়েছে কতটির, মামলা হয়েছে কতটি, আর ন্যায়বিচার পেয়েছেন কতজন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ্যে আসা জরুরি।

অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

৯ মাসের পরিসংখ্যান কী বলছে?

প্রকাশিত আউটপাস-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ফেরা নারী কর্মীদের দেশভিত্তিক কয়েকটি সংখ্যা হলো—

– সৌদি আরব: ৯৭৯ জন
– জর্ডান: ২২৭ জন
– সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৭৮ জন
– ভারত: ৫২ জন
– মালয়েশিয়া: ৪৮ জন

একই প্রতিবেদনে মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মী দেশে ফেরার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব সংখ্যা দেশে ফেরা নারী কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। আউটপাসের হিসাব মূলত নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরাদের তথ্য ধারণ করে। তাই এই পরিসংখ্যানকে বিদেশে কর্মরত সব নারী শ্রমিকের নির্যাতনের হার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

দেশে ফেরার পর তাঁদের পাশে কে দাঁড়াচ্ছে?

বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা একজন নারী কর্মীর সংকট বিমানবন্দরে শেষ হয় না। অনেকের সামনে থাকে ঋণ পরিশোধের চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট মানসিক ক্ষত।

এ অবস্থায় প্রয়োজন চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। পাশাপাশি বিদেশে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশের দূতাবাসের সমন্বয়ে তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো, প্রবাসীকল্যাণ কর্তৃপক্ষ, দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কোনো নিয়োগকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকারের কাছে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন

৯৭৯ নারী কর্মীর সৌদি আরব থেকে ফিরে আসার পরিসংখ্যান সামনে আসার পর কয়েকটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—

১. তাঁদের কতজন নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়েছেন?

২. যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের অভিযোগ কতটি নথিভুক্ত হয়েছে?

৩. অভিযোগগুলোর তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে?

৪. দেশে ফেরা নারী কর্মীদের পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

৫. বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও দূতাবাসের তদারকি কীভাবে আরও কার্যকর করা হচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, যাচাইকৃত পরিসংখ্যান এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্য। জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।

শ্রমবাজারের সাফল্য যেন নারীর নিরাপত্তার বিনিময়ে না হয়

বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বহু পরিবারের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, মানবিক আচরণ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রার আগে নিয়োগকর্তা যাচাই, চাকরির চুক্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে বিপদে পড়লে দ্রুত উদ্ধার ও দেশে ফেরার সহায়তা দিতে হবে।

প্রবাসে নারীর শ্রম গ্রহণ করা হবে, অথচ তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা উপেক্ষিত থাকবে—এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ৯৭৯ জনের প্রত্যাবর্তনের পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা প্রতিটি অভিজ্ঞতা যাচাই করা, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং ন্যায়বিচারের অগ্রগতি প্রকাশ করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

নারী কর্মীদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।